মালিহা আঞ্জুম দিয়া, অনলাইনে Dee নামে বেশি জনপ্রিয় (ইন্সটাগ্রামে @deez_nutscosplays), একজন বাংলাদেশি কসপ্লেয়ার। কসপ্লে করার মাধ্যমে কল্পনার জগতের চরিত্রগুলোকে বাস্তবে নিয়ে আসা ব্যাপারটা তাকে আনন্দ দেয়। তিনি এখন পর্যন্ত অনেকগুলো ক্যারেক্টার কসপ্লে করেছেন, যা এসেছে বিভিন্ন অ্যানিমে, গেইস এবং কমিক থেকে। যার মধ্যে অন্যতম হলো ওয়ান পিসের লুফি, জুজুৎসু কাইসেনের চোসো, ডেমন স্লেয়ারের আকাজা, সাইকিক-ফেইরি টাইপের পোকারমন গার্ডেভোয়ার এবং মার্ভেল কমিক্স-এর ব্ল্যাক উইডো। মালিহা অনেক ছোট থেকেই অ্যানিমে এবং সুপারহিরো ক্যারেক্টার বা কমিক্স এর প্রতি অনেক আকৃষ্ট ছিলেন। সবসময় সেই দুনিয়াতে চলে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল তাঁর মধ্যে। বিশ্বব্যাপি করোনাভাইরাস আতঙ্ক এবং লকডাউনের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বিদেশি কসপ্লেয়ার দের দেখে তাঁর ছোট বেলার সেই ইচ্ছাটা পুনরায় জাগ্রত হয়। আমরা ওটাকু বাংলা টিম মালিহা-র সাথে কথা বলেছি এবং জানার চেষ্টা করেছি তাঁর কসপ্লে যাত্রা সম্পর্কে।

প্রশ্ন: আপনি কসপ্লে শুরু করলেন কীভাবে?
উত্তর: আমার কসপ্ল করার আসল অনুপ্রেরণা এসেছে ২০২২ সালে একটি ইভেন্টে গিয়ে। সে বছর ডিসেম্বর মাসে একটি ইভেন্টে গিয়ে বিভিন্ন কসপ্লেয়ারদের দেখে এবং তাদের সাথে কথা বলে আমারও কসপ্লে করার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আমি প্রথম কসপ্লে শুরু করি ২০২৩ সালের জুন মাসে অ্যানিমে কন ঢাকা ২০২৩ (AnimeCon Dhaka 2023)-এ। এটা আমার জীবনের দ্বিতীয় অ্যানিমে ইভেন্ট ছিল। কিন্তু এটাই ছিল সেই ইভেন্ট যেখানে আমি প্রথমবার কসপ্লে করি। দিনটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিনগুলোর একটি দিন হয়ে থাকবে।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম কসপ্লের অনুপ্রাণিত কী?
উত্তর: আমার প্রথম কসপ্লের অনুপ্রেরণা ওয়ান পিস-এর মাংকি ডি. লুফি। আমরা সবাই জানি ওয়ান পিস একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যানিমে। আবার লুফি আমার প্রিয় চরিত্রগুলোর একটি, যদিও আমি এখনো পুরো শো শেষ করতে পারিনি। আমি লুফির সঙ্গে নিজেকে অনেকটাই মিলিয়ে দেখি। তাই আমি তাকে কসপ্লে করতে চেয়েছিলাম। তার হাসি আর অন্যদের ভালো রাখার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে। নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তার অদম্য মনোভাব আমাকে প্রচুর অনুপ্রাণিত করেছে বাস্তব জীবনেও। তাই আমি ভেবেছিলাম, তাকে সম্মান জানানোর এর চেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। এছাড়া একজন নতুন কসপ্লেয়ার হিসেবে এটি আমার জন্য অনেক সহজ একটি কসপ্লে ছিল।
প্রশ্ন: কসপ্লে করতে গিয়ে আপনার মনে রাখার মতো কিছু অভিজ্ঞতা বলবেন?
উত্তর: কসপ্লে করতে গিয়ে সবচেয়ে মনে রাখার মতো মুহূর্ত ছিল যখন আমার প্রথম কসপ্লে এর সাথে অনেকে ছবি তুলতে এসেছিল। আমি খুবই ইন্ট্রোভার্ট আর সংযত স্বভাবের একজন মানুষ, তবে হুট করে এত মানুষের অ্যাটেনশন পাওয়ায় অভিজ্ঞতাটি আমার জন্য অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ছিল, যা আমি সারাজীবন মনে রাখব।
আমি তো কখনোই কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছায় কসপ্লে করি না। তবে যখন ছোট-ছোট বাবুরা আমার সাথে ছবি তুলতে এসেছিলো, ওই মুহূর্তটাই আমার জন্য সব থেকে বড় সার্থকতা। এই মুহূর্তগুলোই আমার কসপ্লে জীবনের সবচেয়ে সেরা এবং দামী মুহুর্তের মধ্যে একটি করে তুলেছে।
প্রশ্ন: কসপ্লে জার্নিতে আপনি কি কোনো চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?
উত্তর: হ্যাঁ, কসপ্লেয়ার হওয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জিং দিক হলো উপযুক্ত ম্যাটারিয়াল খুঁজে পাওয়া। বাংলাদেশে কসপ্লে কালচারটা তুলনামূলক এখনও অনেক নতুন। অনেক কিছুই তাই এখানে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। এছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের কাজ কর্মের সাথে সময় ম্যানেজ করাটাও অনেক কষ্টসাধ্য।

আমি অনেকবার সঠিক ম্যাটারিয়ালের সংকটে পড়েছি, কিন্তু পরিকল্পনা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। বন্ধুদের সাহায্যের জন্য এই সমস্যাটা অত বেশি কষ্ট দেয় নি। তবে বাবা-মা কে বুঝাতে একটু কষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে বাবাকে। আমার আম্মু নিজেই অনেক ক্রিয়েটিভ আর থিয়েটার করতো একসময়। তাই সে তেমন কিছু বলেনি কখনও এবং বাবাকে পুরো ব্যাপারটা বোঝানোর পড় সেও বেশি কিছু বলে নি।
প্রশ্ন: আপনি কীভাবে আপনার কস্টিউম পরিকল্পনা বা তৈরি করেন?
উত্তর: আমি আমার কস্টিউমের পরিকল্পনা করি মূলত অনলাইনে রিসার্চ করে। তবে আমি চেষ্টা করি পুরোপুরি কপি না করে কিছুটা নিজস্ব ভাইব অ্যাড করার। এক্ষেত্রে স্কেচ এঁকে রিসার্চের আইডিয়ার সাথে নিজের আইডিয়া মিলিয়ে নিজস্ব একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেই কস্টিউম তৈরি করতে পছন্দ করি তবে আমার বন্ধুরা এবং সিনিয়র কসপ্লেয়াররা আমাকে অনেক সাহায্য করে, যেহেতু আমি এখনো কিছুটা নতুন। তবে আবার কখনও-কখনও কস্টিউম মেকার বা টেইলর এর মাধ্যমেও কস্টিউম কমপ্লিট করি, যখন নিজের সময় ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না তখন।



প্রশ্ন: কসপ্লে নিয়ে আপনার আপনার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?
উত্তর: আমার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো:
– অনেক নতুন-নতুন ক্যারেক্টার কসপ্লে করা।
– আরও উন্নত কস্টিউম ডিজাইন করা।
– নতুন-নতুন স্কিল শিখা।
– অন্য নতুন কসপ্লেয়ারদের সাহায্য করা।
– ভবিষ্যতে Jojo’s Bizarre Adventure অ্যানিমে থেকে বেশ কিছু ক্যারেক্টার কসপ্লে করতে ইচ্ছুক।
– অনেকগুলো পোকেমন কসপ্লে করা।
প্রশ্ন: নতুন কসপ্লেয়ারদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
উত্তর: নতুন কসপ্লেয়ারদের বলব:
– ছোট কিছু দিয়ে শুরু করুন। কঠিন ডিজাইন দিয়ে শুরু না করাই ভালো। তবে যদি আপনি কিছু এপিক চরিত্র দিয়ে শুরু করতে চান, তাহলে চরিত্রের যতটা সম্ভব কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করুন। তবে আমি বলব, আস্তে-আস্তে বড় প্রজেক্টের দিকে এগোনোই ভালো।
– একটা বাজেট ফিক্সড করে সেটার ওপর বেইস করে পরিকল্পনা করুন এবং তার মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করুন। নিজে নিজে তৈরি করা শিখতে পারলে সবচেয়ে ভালো।
– কনফিডেন্ট হোন অ্যান্ড হ্যাভ ফান। কসপ্লে পুরোপুরি ভালোবাসা আর প্যাশনের ব্যাপার।
প্রশ্ন: নতুন কসপ্লেয়ারদের জন্য কিছু টিপস দিবেন?
উত্তর: নতুন কসপ্লেয়ারদের জন্য টিপস:
– কোনো কস্টিউম পারফেক্ট হতে হবে এমন মানসিকতা ত্যাগ করুন। তবে কস্টিউম যতটা সহজে চেনা যায় ততই ভালো।
– অনলাইনে টিউটোরিয়াল এবং রিসোর্স ব্যবহার করুন। এখন আমাদের হাতের মুঠোতেই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রয়েছে, এটি যতটা সম্ভব ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
– নতুন বন্ধু তৈরি করুন, একটি কমিউনিটি গড়ে তুলুন যারা সেইম ইন্টারেস্ট শেয়ার করে। এটা আপনান যাত্রাকে দশ গুণ বেশি এনজয়েবল করে তুলবে।
– সবসময় পজিটিভ থাকুন এবং যতটা সম্ভব এনজয় করুন পুরো প্রসেসকে।
প্রশ্ন: কসপ্লের বাইরে আপনি?
উত্তর: কসপ্লের বাইরে আমি সিএসই শেষ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী এবং বেশিরভাগ সময় পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমি ছবি আঁকতে, মুভি দেখতে ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করি।
ফান ফ্যাক্ট:
মালিহার-
• প্রিয় অ্যানিমে: Jojo’s Bizarre Adventure.
• কস্টিউম তৈরি করার সময় প্রিয় কাজ: ক্লাসিক্যাল মিউজিক এবং অডিও বুকস শোনা।
• ইন্সটাগ্রাম
• ফেসবুক
সাক্ষাৎকারটি ওটাকু বাংলা-র ম্যাগাজিনের জন্য নেওয়া হয়েছিলো। ম্যাগাজিনটি স্থগিত করা হয়।
এই সাক্ষাৎকারে সময় দেওয়ার জন্য আমরা মালিহা আঞ্জুম দিয়া-কে ধন্যবাদ জানাতে চাই।
