মালিহা মেহেরিন, অনলাইনে তোমি (Tomie) নামে বেশি জনপ্রিয় (ইন্সটাগ্রাম: @tomie_re), বাংলাদেশের মোস্ট ট্যালেন্টেড কসপ্লে আর্টিস্টদের মধ্যে একজন। কসপ্লে করার জন্য তার ডেডিকেশন একদম অন্য লেভেলের। একটি কস্টিউম তৈরি করা জন্য দীর্ঘ ২ বছর পরিশ্রম করার রেকর্ডও আছে তার। বাংলাদেশের কমপ্লে কালচারে তাকে দেখেনি বা চেনেনা এমন মানুষ নেহাত কমই আছে। আমরা ওটাকু বাংলা টিম কথা বলেছি তোমি-র সাথে তার কসপ্লে জার্নির একটু অংশ আমাদের সাথে শেয়ার করা জন্য।
প্রশ্ন: আপনি কসপ্লে শুরু করলেন কীভাবে?
উত্তর: আমি কসপ্লে সম্পর্কে প্রথম ২০১৩ সালে জানতে পারি। সেখান থেকেই আমার মধ্যে কসপ্লে করার ইচ্ছা তৈরি হতে থাকে এবং ২০১৬ সালে একটি ইভেন্টে আমি প্রথম কসপ্লে করি। সেটাই ছিলো আনুষ্ঠানিকভাবে আমার কসপ্লে জার্নির শুরু। সেই সময় আমি যে অ্যানিমেটি দেখছিলাম, তা থেকেই মূলত কসপ্লে করার জন্য ইন্সপায়ার্ড হই।
প্রথমে, এটা কেবল একটি ফান হবি ছিল, একই জিনিস পছন্দ করে এমন লোকেদের সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি উপায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, আমি এটাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে শুরু করি এবং এটা দিয়ে ইউনিক কিছু করতে চেয়েছিলাম।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম কসপ্লের অনুপ্রেরণা কী?
উত্তর: নট আ লং স্টোরি। বেসিক্যালি আমি তখন টোকিও ঘৌল অ্যানিমে দেখছিলাম এবং এর উতা (Uta) চরিত্রটি আমার খুব ভালো লাগে। উতা-র ক্যারেক্টার ডিজাইন এবং অন্যান্য সবকিছুই ছিল ভীষণ ইউনিক আর আলাদা। তাই আমি উতা-র কসপ্লে করার সিদ্ধান্ত নিই এবং শেষ পর্যন্ত সফল হই। বিষয়টা এতটাই সহজ ছিল আমার জন্য।

প্রশ্ন: কসপ্লে করতে গিয়ে আপনার মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা কোনটি?
উত্তর: আমার মনে হয়, ২০২৩ সালে একটি কনভেনশনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাই আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কসপ্লে মুহূর্ত। সংগত কারণেই আমি কনভেনশন এবং অর্গানাইজারদের নাম বলতে চাচ্ছি না।

সেবার আমি ‘ট্রিনিটি ব্লাড’ অ্যানিমের সেথ (Seth) চরিত্রে কসপ্লে করেছিলাম। ক্যারেক্টারটি আমার ড্রিম কসপ্লেগুলোর একটি ছিল এবং একই সঙ্গে আমার কসপ্লে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জটিল কস্টিউমগুলোর একটি। ফলাফল ছিল দারুণ, এবং আমি শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিলাম। প্রতিযোগিতা ছিল অত্যন্ত কঠিন, তাই শীর্ষ পাঁচে থাকতে পেরে আমি ভীষণ খুশি ছিলাম।
প্রশ্ন: কসপ্লে জার্নিতে আপনি কি কোনো চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?
উত্তর: সত্যি বলতে এত বছর পরেও বাংলাদেশে কসপ্লে কালচার এখনও নতুন একটি কনসেপ্ট আর মানুষ এখনো একে তেমনভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। একজন কসপ্লেয়ার হিসাবে এটাই অনেকটা চ্যালেঞ্জের একটা বিষয়।
মানুষ এখনও কসপ্লে কনসেপ্ট পুরোপুরি বোঝে না। মানুষ প্রচুর সমালোচনা করে, বিশেষ করে মূল ক্যারেক্টার সাথে তুলনা করে। তারা বুঝতে চায় না এটা একটা আর্ট। যখন বিদেশি কসপ্লেয়ারদের সাথে কমপেয়ার করে খারাপ কমেন্ট করে তখন হতাশ লাগে।
প্রশ্ন: আপনি কীভাবে আপনার কস্টিউম পরিকল্পনা বা তৈরি করেন?
উত্তর: আমার পরিকল্পনা বেশ সোজাসাপ্টা। আমি যেহেতু ফেব্রিক-বেইসড কসপ্লেয়ার, আমার প্রতিটি ফেব্রিক-বেইসড কস্টিউম আমি একা নিজের হাতে তৈরি করি। প্রপসও নিজে বানাই। প্রথমে ক্যারেক্টার সিলেক্ট করে একটা প্ল্যান করি। তারপর সে অনুযায়ী এক্সিকিউশন। আর কস্টিউমের সাথে মানানসই প্রপস বা চার্ম তৈরি করতে আমি থ্রিডি প্রিন্টারও ব্যবহার করে থাকি।

প্রশ্ন: আপনি কোন থ্রিডি প্রিন্টার ব্যবহার করেন?
উত্তর: আমি ELEGOO এর Neptune 4 Max মডেলের থ্রিডি প্রিন্টার ব্যবহার করি।
প্রশ্ন: কসপ্লে নিয়ে কাজ করার সময় আপনি কী করতে পছন্দ করেন?
উত্তর: কস্টিউম নিয়ে কাজ করার সময় আমার সঙ্গী হয় কফি আর সাথে কোনো মার্ডার/মিস্ট্রি পডকাস্ট। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি হারিয়ে যাই কোনো রহস্যময়, গা ছমছমে জগতে, সাথে তৈরি হতে থাকে আমার কস্টিউম। সৃজনশীলতাকে উসকে দিতে রহস্যের জুড়ি নেই!
প্রশ্ন: নতুন কসপ্লেয়ারদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
উত্তর: নতুনদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, তারা যেন এমন ক্যারেক্টার দিয়ে শুরু করে যাদের কস্টিউম ডিজাইন করা সহজ। কম ডিটেইলস থাকা কস্টিউম দিয়ে শুরু করা সাধারণত সহজ হয়, বিশেষ করে যারা নিজের কস্টিউম নিজে তৈরি করতে চায়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কসপ্লের কস্টিউম তৈরি করা কি কঠিন?
উত্তর: একদমই না। বাংলাদেশে কস্টিউম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণই পাওয়া যায়, তা ফেব্রিক-বেইসড হোক বা আর্মর-বেইসড। এর জন্য একটি প্রপার আইডিয়া আর প্ল্যান থাকলেই যেকোনো কস্টিউম বানানো সম্ভব।

ডিটেইলড কস্টিউম তৈরি করতে সাধারণত আমার প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগে। তবে সহজ কস্টিউমের জন্য এক সপ্তাহই যথেষ্ট।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কসপ্লে কালচার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন
উত্তর: অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা কসপ্লেকে প্যাশন বা শখ হিসেবে তেমন সমর্থন করে না। এর কারণও অবশ্য আছে। একে তো কসপ্লে ধারণাটি বেশ নতুন আর তারপর আবার এটি আমাদের নিজস্ব কালচারের অংশ না। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে সৃজনশীল কাজ বা শখগুলো তেমন গুরুত্ব পায় না। ফলস্বরূপ কসপ্লে কালচার বিকাশে বেশ বড় ধরণের হাতাশা হাতছানি দিচ্ছে।
প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: আমি কসপ্লে করা শুরু করি কারণ ছোটবেলা থেকেই অভিনয় এবং ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ ছিল। কসপ্লে আমাকে কস্টিউম ডিজাইন এবং তৈরি করার সৃজনশীল আনন্দ উপভোগ করতে দেয়, একই সঙ্গে আমাকে অভিনয়ের মাধ্যমে অন্য একটি চরিত্রের জীবনে প্রবেশ করার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়। প্রতিটি কসপ্লে যেন আমার জন্য একটি নতুন জগতে পা রাখা।
ভবিষ্যতের কথা বলতে গেলে, ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি আর তেমন আগ্রহ নেই, তবে নাটক বা থিয়েটারে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখি। অভিনয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে এই পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। যদি সঠিক সুযোগ পাই, তবে নাটক ও থিয়েটারের জগতে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে একটি কোর্স করার ইচ্ছা আছে। আশা করি, একদিন আমার স্বপ্নগুলো বাস্তব হবে।
















ফান ফ্যাক্ট:
তোমির-
• পছন্দের অ্যানিমে: নানা, ওয়ান পিস, এলফেন লাইড, জুনজি ইতো কালেকশন, ইয়ামিসিবাই, পেট শপ অব হররস, ডেথ নোট, মব সাইকো ১০০।
• ইনস্টাগ্রাম
• ফেইবুক
• থ্রেডস
এই সাক্ষাৎকারে সময় দেওয়ার জন্য আমরা মেহরিন মালিহা-কে ধন্যবাদ জানাতে চাই।
