বাংলাদেশে কসপ্লে কালচার ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, আর এরই মাঝে বাংলাদেশি কসপ্লেয়াররা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজেদের পরিচিত করে তুলছেন। তাদের মধ্যেই অন্যতম তাহিয়া ফারহান (ইন্সটাগ্রাম: @tahiafarhan), যিনি নিজের ভালোবাসা, সময়, কঠোর পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতা দিয়ে কসপ্লেকে শুধু শখ হিসেবেই নয়, বরং নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ, দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপে তিনি কসপ্লের প্রতি নিজের আগ্রহকে লালন করেছেন।
তার কসপ্লে শুরু করার গল্প, প্রথম অনুপ্রেরণা, অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে তিনি আজ অনেক নতুন কসপ্লেয়ারের অনুপ্রেরণা। সৃজনশীলতা, দৃঢ়তা ও স্বপ্নপূরণের পথচলার এক অসাধারণ গল্প আজ শেয়ার করলেন তিনি ওটাকু বাংলা-র সঙ্গে।
প্রশ্ন: আপনি কসপ্লে শুরু করলেন কীভাবে? আপনার যাত্রার শুরুটা কেমন ছিল?
উত্তর: আমি বহু বছর ধরেই কসপ্লের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় কখনো ঠিকভাবে শুরু করার সুযোগ পাইনি। তখন কসপ্লে এখনকার মতো এতটা জনপ্রিয় ছিল না, বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো শহরে। তার ওপর আমার স্থায়ী কোনো আয় ছিল না, সময়ও খুব সীমিত ছিল। তখন আমি পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জব করতাম, ফলে কোনো শখে নিয়মিতভাবে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল।
বিদেশে এসে পড়াশোনা শেষ করে একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার পর আমার জীবনে কিছুটা স্থিরতা আসে। সময়, অর্থ এবং মানসিক প্রস্তুতি, সবকিছুই তখন নিজের পছন্দের কাজের পেছনে ব্যয় করতে পারতাম। ছোটবেলা থেকেই প্রিয় চরিত্রদের মতো সাজতে খুব ভালো লাগত, তাই ধীরে ধীরে কসপ্লে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করি। যখন আমি আমার প্রথম লুকগুলো অনলাইনে শেয়ার করি, তখন পাওয়া পজিটিভ রিঅ্যাকশন আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই মুহূর্তেই মনে হয়েছিল, অবশেষে আমি এমন একটি যাত্রা শুরু করলাম, যার জন্য এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম কসপ্লের অনুপ্রেরণা কী ছিল?
উত্তর: আমার প্রথম কসপ্লে ছিল Spider-Gwen এবং Nezuko। Spider-Gwen চরিত্রটিকে আমি অনেকদিন ধরেই খুব পছন্দ করতাম, বিশেষ করে Spider-Man এর Spider-Verse মুভিগুলো দেখার পর চরিত্রটা আমার কাছে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। আর Nezuko-র ক্ষেত্রে, তখন আমি Demon Slayer সিরিজটাতে খুব বেশি আসক্ত ছিলাম, তাই তাকে দিয়েই শুরু করাটা সহজ আর বেটার মনে হয়েছিল।


তবে আমার প্রথম কমিটেড কসপ্লে ছিল The Apothecary Diaries–এর Maomao চরিত্রটি। এই চরিত্রটাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, আর এই কসপ্লেটার জন্য আমি সত্যিকার অর্থেই সময়, শ্রম এবং মনোযোগ দিয়েছিলাম। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, পরিবারের মানুষ, কনভেনশনে থাকা অচেনা মানুষ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছিলাম। এতে আমি নিজের এফোর্ড, নিজের পরিশ্রম নিয়ে গর্ব অনুভব করেছি এবং নিয়মিতভাবে কসপ্লে চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।
প্রশ্ন: কসপ্লে বেছে নেওয়ার পেছনে কী আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?
উত্তর: আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে কোনো কাল্পনিক চরিত্রকে বাস্তবে জীবন্ত করে তোলার ভাবনাটা। মেকআপ, কস্টিউম আর এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে শুধুমাত্র অ্যানিমেশনে থাকা কোনো চরিত্রকে বাস্তবের মতো ফুটিয়ে তোলা, এই বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করে।
আমি ন্যাচারালি শক্তিশালী এবং ওয়েল-রিটেন ফিমেল চরিত্রগুলোর দিকেই বেশি আকৃষ্ট হই, এমনকি ভিলেন চরিত্রও। যেমন, আমার পরবর্তী পরিকল্পিত কসপ্লে হলো Frieren, কারণ এই অ্যানিমেটায় ফিমেল লিড চরিত্রগুলো খুব শক্তিশালী এবং সুন্দরভাবে নির্মিত।
প্রশ্ন: কসপ্লে করতে গিয়ে আপনার মনে রাখার মতো সবচেয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা কোনটি?
উত্তর: আমার সবচেয়ে মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল EDMONTON EXPO 2025 কনভেনশনে। সেখানে আমি Maomao কসপ্লে করেছিলাম। অনেক মানুষ, এমনকি ছোট বাচ্চারাও আমার সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছিল। আর এই ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ হ্যাপি ফিল করিয়েছিল এবং আমার কনফিডেন্সকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।

এর পাশাপাশি কসপ্লে কমিউনিটির মানুষদের আন্তরিকতা এই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তুলেছিল। আমি যেসব কসপ্লেয়ারের সঙ্গে সরাসরি বা অনলাইনে পরিচিত হয়েছি, সবাই খুব সাপোর্টিভ এবং স্যুইট। এমন একটা কমিউনিটির অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত, যেখানে সবাই একে অপরের ক্রিয়েটিভিটিকে সম্মান করে।
প্রশ্ন: আপনার কসপ্লে জার্নিতে কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল? কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
উত্তর: আমার কসপ্লে যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উইগ। উইগ স্টাইল করার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা এখনও কম, তাই ঠিকমতো সেট করতে অনেক সময় লাগে। এছাড়াও অনেকক্ষণ ঠিক জায়গায় ধরে রাখতেও অনেক বেগ পেতে হয়। বিষয়টা কঠিন হলেও প্রতিবারের পরিশ্রমটা শেষ পর্যন্ত সার্থক মনে হয়। প্রতিটা নতুন কসপ্লের সঙ্গে সঙ্গে আমি ধীরে ধীরে শিখছি এবং নিজের স্কিলও আগের থেকে উন্নত করছি।
প্রশ্ন: আপনি কীভাবে আপনার কস্টিউম পরিকল্পনা বা তৈরি করেন?
উত্তর: আমি সাধারণত প্রতি মাসে একটি কসপ্লে করার টার্গেট রাখি। এই ১ মাস আমি রিসার্চ, প্ল্যান আর প্রয়োজনীয় সব উপকরণ জোগাড় করার জন্য ব্যবহার করি যাতে কসপ্লেটা যতটা সম্ভব নিখুঁত হয়। আমি ছোটখাটো ডিটেইলের দিকেও বিশেষভাবে নজর দিই, কারণ আমার কাছে অ্যাকুরেসি খুব গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে, Makima কসপ্লের জন্য আমি বিশেষভাবে মাঙ্গার সঙ্গে মিল রেখে লাল রিংযুক্ত কন্ট্যাক্ট লেন্স খুঁজেছিলাম। মূল চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যতটা সম্ভব তার মতো করে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করি, কারণ আমি চাই চরিত্রগুলোর প্রতি ন্যায্যতা বজায় রাখতে।



প্রশ্ন: কসপ্লের কোন অংশটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়?
উত্তর: আমার সবচেয়ে প্রিয় অংশ হলো মেকআপ। আমার ইনস্টাগ্রাম দেখলে বুঝতে পারবেন যে, আগে আমি মেকআপ আর্টিস্ট ছিলাম, তাই কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজের মুখের গড়ন, শেপিং আর এক্সপ্রেশন মিলিয়ে নেওয়াটা আমার কাছে খুব আনন্দের। ডিটেইলিং, কনট্যুরিং আর এক্সপ্রেশন নিয়ে কাজ করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মজার লাগে। অবশ্যই কস্টিউম আর উইগ পুরো লুকটা সম্পূর্ণ করে, কিন্তু আমার কাছে মেকআপই সেই অংশ, যেটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কসপ্লে কালচার সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
উত্তর: যদিও আমি এখন আর বাংলাদেশে থাকি না, তবুও আমি এই কমিউনিটির অংশ হতে চাই। সেই কারণেই আমি অনলাইনে বাংলাদেশের কসপ্লে কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। গত এক দশকে এই কালচারটা যেভাবে বেড়েছে, সেটা দেখে আমার খুব ভালো লাগে। এখন কসপ্লেকে একটা আর্ট বা শিল্পমাধ্যম হিসেবে সম্মান দেওয়া হচ্ছে, আর বাংলাদেশে এটার এক্সপ্যানশন হতে দেখাটা আমাকে সত্যিই খুব আনন্দ দেয়। ভবিষ্যতে যদি আমার বাংলাদেশে যাওয়ার সময়ের সঙ্গে কোনো কনভেনশনের সময় মিলে যায়, তাহলে আমি অবশ্যই সেখানে অংশ নিতে চাই।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা কেমন?
উত্তর: এই অভিজ্ঞতাটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, এক কথায় সত্যিই অসাধারণ। আমি বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি, আর এই বড় কমিউনিটি আমাকে শেখার এবং নিজেকে গড়ে তোলার অনেক সুযোগ দিয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার কসপ্লেগুলো খুব ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, আর ভবিষ্যতে আরও ইভেন্টে অংশ নিতে আমি ভীষণ আগ্রহী। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, এখানকার মানুষগুলো খুব সাপোর্টিভ, এতে পুরো পরিবেশটাই ভীষণ আপলিফ্টিং এবং ইন্সপায়ারিং মনে হয়।
প্রশ্ন: নতুন কসপ্লেয়ারদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর: শুরুটা একদম সহজভাবে করুন, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। কসপ্লে মানেই কসপ্লে, আপনি চাইলে বড় করে করতে পারেন, না চাইলে খুব সাধারণ রাখলেও কোনো সমস্যা নেই। মূল বিষয় হলো এনজয় করা এবং এমন এক কমিউনিটির অংশ হওয়া, যারা আপনার মতোই একই জিনিস ভালোবাসে।
আপনি চাইলে নিজেকে পুরোপুরি কমিট করতে পারেন। কিন্তু সব সময় বড় বাজেট বা বড় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব না হলেও ইট’স ওকে। যেটা আপনার কাছে স্বাচ্ছন্দ্য লাগে, সেটাই করুন। সময়ের সঙ্গে আপনি চাইলে আরও উন্নতি করতে পারবেন, আরও ডিটেইল অ্যাড করতে পারবেন।
প্রশ্ন: কসপ্লের বাইরের আপনার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
উত্তর: কসপ্লের বাইরে আমি ফুল-টাইম একটি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট রিলেটেড কাজে যুক্ত আছি। আমার শিডিউল বেশ টাইট, ভোর ৬টায় বাসা থেকে বের হতে হয় এবং সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিরি। তবুও আমি আমার পছন্দের কাজগুলোর জন্য সময় বের করে নিই।
ফ্রি সময়ে আমি আঁকতে, মেকআপ করতে, রান্না করতে এবং গেম খেলতে ভালোবাসি। নতুন রেসিপি চেষ্টা করা, নতুন মেকআপ লুক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা, আর ভিডিও গেম খেলে রিল্যাক্স করা আমার কাছে অনেক আনন্দের। এছাড়াও অ্যানিমে দেখা, পড়া, আর পরবর্তী কসপ্লের পরিকল্পনা করতেও ভালো লাগে। যেকোনো কিছু যা আমাকে ক্রিয়েটিভ ভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে দেয়, সেগুলোই আমাকে সবচেয়ে বেশি খুশি করে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কসপ্লে নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
উত্তর: আমি ভবিষ্যতে আরও নিয়মিতভাবে কসপ্লে করতে চাই এবং নিজের স্কিলগুলো আরও উন্নত করতে চাই। উইগ স্টাইলিং ঠিকভাবে শিখতে চাই, আর ধীরে ধীরে নিজের প্রপস ও কস্টিউম নিজেই বানানোর দিকেও যেতে চাই।
ইতিমধ্যে কয়েকটি কসপ্লে প্ল্যান করা আছে, আর সম্ভবত আমার পরবর্তী কসপ্লে হবে ফ্রিরেন।
প্রশ্ন: কসপ্লের বাইরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: কসপ্লের বাইরে আমার মূল লক্ষ্য হলো ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই, বড় দায়িত্ব নিতে চাই, আর দীর্ঘমেয়াদে নিজের ক্ষেত্রটিতে স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চাই।
এর পাশাপাশি জীবনে একটি সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখতে চাই, শখগুলো উপভোগ করা, নতুন দক্ষতা শেখা, আর কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো।





ফান ফ্যাক্ট:
তাহিয়া-র
• প্রিয় অ্যানিমে: অ্যাটাক অন টাইটান
• প্রিয় গেইম: সম্প্রতি Horizon, তবে নিয়মিতভাবে Call of Duty এবং Battlefield
• প্রিয় ফ্যানডম: নারুতো ফ্যানডম। ৭ বছর বয়স থেকে তাহিয়া নারুতোর ফ্যান
• ইনস্টাগ্রাম
• ফেসবুক
ওটাকু বাংলা-তে এভ সাক্ষাৎকারটি দেয়ার জন্য ওবি টিমের পক্ষ থেকে তাহিয়া ফারহান কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।

You are doing a wonderful job . Truly inspiring for all of us. I hope to see you shine in many different characters on the Cosmoplay platform. Wishing you all the best.
MY SIS IS THE COOLES5T IM SO PROUD OF HER. YOU ALWAYS NAIL EVERYTHING <3 You are my pride 🩷🫶 never stop shining !!!