বাংলাদেশের কমিক, মাঙ্গা, অ্যানিমেশন ও স্থানীয় ক্রিয়েটিভ কালচারকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো দেশি কমিক কন ঢাকা ২০২৬ (Deshi Comic Con Dhaka 2026)। গত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ঢাকার মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল Eventors BD। দেশের নিজস্ব কমিক, মাঙ্গা ও সৃজনশীল সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মাতাদের, শিল্পীদের, প্রকাশকদের ও দর্শকদের এক জায়গায় আনার লক্ষ্যেই আয়োজনটির যাত্রা শুরু।
প্রথম আয়োজন হিসেবে দেশি কমিক কন ঢাকায় ছিল বেশ কিছু আকর্ষণীয় আয়োজন। পাশাপাশি ছিল কিছু ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতিও। ফলে পুরো আয়োজনটি যেমন দেশি ক্রিয়েটিভ কালচারকে সামনে আনার সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তেমনই ভবিষ্যৎ আয়োজনে কোন জায়গাগুলোতে আরও উন্নতি দরকার, সেটিও স্পষ্ট করেছে।
আয়োজনের শুরুতেই ছিল শিশুদের আর্ট কম্পিটিশন। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিশুরা একই ছবি আঁকলেও প্রত্যেকে নিজের মতো করে সেটিকে উপস্থাপন করে। শিশুদের এই আঁকার বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উন্মাদ ম্যাগাজিনের আহসান হাবিব। শুরুতেই শিশুদের নিয়ে এমন একটি সেগমেন্ট আয়োজনের ফলে অনুষ্ঠানটির পরিবেশে পারিবারিক আবহ তৈরি হয়।

এরপর ঢাকা কমিক ও কার্টুন পিপলের তন্ময়ের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। কমিক ও কার্টুন নিয়ে আগ্রহী দর্শকদের জন্য এই অংশটি ছিল আয়োজনের অন্যতম প্রাসঙ্গিক সেগমেন্ট, তবে সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। এই আয়োজন বিরতির পরে করা উচিত ছিলো। ওয়ার্কশপ শেষে লম্বা বিরতির পর আবার মূল মঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয় নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে।
সেগমেন্টটির নাম ছিল ক্লাসিক্যাল ডান্স। যদিও পরিবেশনায় মূলত বাংলা ফোক আর আধুনিক গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। নাম ও পরিবেশনার ধরনে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও দর্শকদের মধ্যে এই অংশটি বেশ সাড়া তৈরি করে। বিরতির পর মঞ্চে আবার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শুরু হওয়ায় দর্শকদের মধ্যেও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।
এরপর আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে অ্যানিমেশন স্ক্রিনিং। দেশি অ্যানিমেশন ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টকে একটি কমিক কনভেনশনের মূল আয়োজনের অংশ হিসেবে দেখানোর উদ্যোগটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্ক্রিনিংয়ে Sunset Studios এর Dead End এর ট্রেইলার দেখানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণাধীন থাকা এই প্রকল্পটি বাংলাদেশি অ্যানিমেশন অঙ্গনে বেশ আগে থেকেই আলোচনায় রয়েছে। Sunset Studios ২০২৩ সালেই Dead End কে নিজেদের বড় অ্যানিমেশন প্রকল্প হিসেবে সামনে এনেছিল।
স্ক্রিনিংয়ে The Second Studio এর অ্যানিমেশনও দেখানো হয়। ঢাকাভিত্তিক এই স্বাধীন ক্রিয়েটিভ কালেক্টিভ অ্যানিমেশন, কমিকস, ভিডিও গেম ও ইলাস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করছে। এর আগর জুনে অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায় তাদের Best Show Everest কেন্দ্রিক প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এছাড়া আইফোনে শুট করা ভিএফএক্স সমৃদ্ধ একটি স্বাধীন দেশি শর্টফিল্মও দর্শকদের দেখানো হয়। বড় স্টুডিওর কাজের পাশাপাশি সীমিত সরঞ্জাম ব্যবহার করে নির্মিত স্বাধীন কাজকে একই মঞ্চে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি ছিল আয়োজনটির ইতিবাচক দিকগুলোর একটি। এতে বোঝা গেছে, দেশি কমিক কন শুধু প্রকাশিত কমিক বা কসপ্লেকে কেন্দ্র করে নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিকেও সামনে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এরপর শুরু হয় প্যানেল ডিসকাশন। কার্টুনিস্ট সত্যজিৎ বিশ্বাসের মাধ্যমে এই সেগমেন্টের সূচনা হয়। প্যানেলে বিভিন্ন অতিথির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অন্তিক অ্যানিমেশন স্টুডিওর অন্তিক মাহমুদ। কমিক, অ্যানিমেশন ও স্থানীয় সৃজনশীল শিল্প নিয়ে আলোচনা করার জন্য এই অংশটি আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে আলোচনা ততটা ফলপ্রসূ বা ইমপ্যাক্টফুল হয়নি বলে মনে হয়েছে।

এরপর ছিল কসপ্লে সেগমেন্ট। আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেশি কসপ্লেকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখানেই আয়োজনের একটি বড় ঘাটতি চোখে পড়ে। পুরো অনুষ্ঠানে কসপ্লেয়ারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। যেসব কসপ্লে দেখা গেছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু ছিল মজাদার ও আকর্ষণীয়। তবে সেগমেন্টটির প্রস্তুতি, অংশগ্রহণের পরিমাণ এবং সামগ্রিক উপস্থাপনা আরও ভালো হলে কসপ্লে অংশটি অনেক বেশি প্রাণবন্ত হতে পারত।

কসপ্লে শেষে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী। এই অংশে ব্যবস্থাপনার কিছু দুর্বলতা বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিজয়ীদের পুরস্কার প্রস্তুত হওয়ার আগেই বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে দেওয়া হয়। ফলে পুরো বিষয়টি কিছুটা অপ্রস্তুত মনে হয়েছে। একটি কমিক কনের মতো আয়োজনের শেষের দিকের গুরুত্বপূর্ণ সেগমেন্টে এমন পরিস্থিতি এড়াতে আগে থেকেই পুরস্কার, বিজয়ীদের তালিকা এবং মঞ্চ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা দরকার ছিল।
হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রেও উন্নতির সুযোগ ছিল। আয়োজকদের হোস্টরা দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও উপস্থাপনার কাঠামো আরও গোছানো হলে মঞ্চের সঙ্গে দর্শকদের যোগাযোগ আরও স্বাভাবিক ও কার্যকর হতে পারত। বিশেষ করে সেগমেন্ট পরিবর্তনের সময় হোস্টিংয়ের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সবশেষে ছিল ব্যান্ড পারফরম্যান্স ও ডিজে পার্টি। দিনের অন্যান্য সেগমেন্টের তুলনায় এই অংশটি ছিল সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল। দর্শকদের একটি অংশ পারফরম্যান্স উপভোগ করলেও পুরো আয়োজনের পরিবেশ অনেক সময় কনসার্টের বদলে অনিয়ন্ত্রিত জমায়েতের মতো মনে হয়েছে। মঞ্চে যারা পারফর্ম করছিলেন, তাদের উচ্ছ্বাসের তুলনায় দর্শকদের সঙ্গে পারফরম্যান্সের সংযোগও খুব শক্তিশালী ছিল না।
বিশেষ করে র্যাপ পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার জায়গা রয়েছে। গানে ব্যবহৃত অশ্রাব্য ভাষা একটি পরিবারবান্ধব আয়োজনের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ছিল না। দেশি কমিক, শিশু, পরিবার এবং তরুণ দর্শকদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে পারফরম্যান্সের কনটেন্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল।
মূল মঞ্চের আয়োজনের বাইরে দেশি ও বিদেশি খাবার, অ্যানিমে মার্চেন্ডাইজ, দেশি কার্ড গেম, দেশি মিনিয়েচার, দেশি কমিক প্রকাশকদের স্টলসহ নানা ধরনের স্টল ছিল। আয়োজনের এই অংশটি তুলনামূলকভাবে বেশ সফল ছিল।



বিশেষ করে অ্যানিমে মার্চেন্ডাইজের স্টলগুলো দর্শকদের আকর্ষণ করেছে। স্টলগুলো বেশ পরিপাটি ছিল এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য দিয়ে সাজানো ছিল। গেমিং স্টল, কার্টুন পিপলের ক্যারিকেচার এবং আরও কয়েকটি স্টলেও আয়োজকদের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যথেষ্ট প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা চোখে পড়েছে। খাবারের দিক থেকেও আয়োজনটি ছিল সন্তোষজনক। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে বেশ কিছু খাবার দর্শকদের কাছে ভালো লেগেছে।

সবকিছু মিলিয়ে প্রথম আয়োজন হিসেবে দেশি কমিক কন ঢাকা ২০২৬ কে সফল বলাই যায়। সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব কমিক, মাঙ্গা, অ্যানিমেশন, কার্টুন ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজকে এক জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা। আয়োজকদের ঘোষিত লক্ষ্যও ছিল স্থানীয় নির্মাতা, শিল্পী, প্রকাশক, শিক্ষার্থী ও ভক্তদের জন্য একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
তবে সম্ভাবনার তুলনায় আয়োজনের ব্যবস্থাপনা আরও দূরদর্শী হতে পারত। কনটেন্টের বৈচিত্র্য ছিল, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আগ্রহ ছিল, স্টলগুলোতেও ভালো প্রস্তুতি দেখা গেছে। কিন্তু মঞ্চ পরিচালনা, কসপ্লে সেগমেন্ট, পুরস্কার বিতরণী, হোস্টিং এবং শেষের দিকের মিউজিক সেগমেন্টে আরও পেশাদার পরিকল্পনা থাকলে আয়োজনটি আরও অনেক বেশি গোছানো হতে পারত।

দেশি কমিক কন ঢাকার প্রথম আয়োজন হিসেবে তাই এটি একই সঙ্গে একটি সফল সূচনা এবং ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার জায়গা। প্রথমবারেই বাংলাদেশের স্থানীয় কমিক ও ক্রিয়েটিভ সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এমন একটি আয়োজন দাঁড় করানো সহজ কাজ নয়। সেই জায়গা থেকে Eventors BD প্রশংসার দাবিদার।
Otaku Bangla দেশি সংস্কৃতি ও স্থানীয় ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে আনার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। পরবর্তী আয়োজনে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা, গোছানো স্টেজ অ্যাংকরিং, শক্তিশালী সেগমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং আরও ভালো কসপ্লে ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার দিকে নজর দিলে দেশি কমিক কন ঢাকার পরবর্তী অধ্যায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
উল্লেখ্য, আয়োজনে ওটাকু বাংলা মিডিয়া পার্টনার হিসাবে অংশগ্রহণ করে।
